ছোনের ভাঁজে বাহারি ডালায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শেরপুরের নারীরা

প্রধান খবর বগুড়ার সংবাদ

এস,আই শাওন:
বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম গোপালপুর। এ গ্রামের পথ ধরে হাটলেই রাস্তার পাশ^বর্তী বাড়িতে বাড়িতে দেখা যায় ৮ থেকে ১০ জন নারীর জটলা। না এটা ঠিক কোন ঝামেলায় সৃষ্ট জটলা নয়। গোছালোভাবে গোলাকার হয়ে বসে আছে এসব নারীরা।

তারা গোলাকার হয়ে বসে খোঁশ গল্পে মেতে আছে বলে দূর থেকে দেখে মনে হলেও তাদের হাতের ছোঁয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে দারিদ্রতা দূরীকরণের গল্প। তারা ছোন দিয়ে বুনে চলছেন বাহারি রঙের ডালা। তাদের হাতের পরশে তৈরী হওয়া নানা ধরণের বাহারি ডালা চলে যাচ্ছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, চীনসহ বিশে^র আরো অনেক দেশে।

এই ছোনের ডালা বুনিয়েই দারিদ্র ঘোচাতে চাইছেন তারা। স্বামী সংসার সন্তান সামলিয়ে সংসারের আরো নানা কাজের পাশাপাশি ছোনের ডালা বুনিয়ে তারা মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা আয় করছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে শুধু এই শেরপুর উপজেলার গোপালপুর গ্রামই নয়, হাপুনিয়া, টুনিপাড়া, খামারকান্দি, গাড়িদহ, কেল্লা, আমইন, জয়নগর ভাতারিয়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের শতশত নারীর প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞে স্থান করে নিয়েছে এই ছোনের ডালা। বাহারি এসকল ডালা বুনিয়ে সংসারের উন্নতির পাশাপাশি স্বামীকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছেন গ্রামীণ এই নারীরা। যদিও, পুঁজির অভাবে অন্যের কন্ট্রাকে কাজ করতে হচ্ছে এ সকল নারীদের।

কথা হয় গোপালপুর গ্রামের সামছুল শেখের মেয়ে তারা বানুর সাথে। তিনি জানান, ছোট বড় ৪ টি ডালা মিলে চারটি ডালাকে ১ সেট বলা হয়। এমন একসেট ডালা বুনিয়ে আমরা ৪৫০ টাকা পেয়ে থাকি। তাতে মাসে দেখা যায় ৮ সেট ডালা বুনানো যায়। এ থেকে ৩ হাজার ছয়শত টাকা উপার্জন হয়।

ডালা বুননকারী আলম আকন্দের স্ত্রী আন্না খাতুন বলেন, আমরা গরীব মানুষ। আমাদের তেমন টাকা পয়সা না থাকায় অন্যের কন্ট্রাকের কাজ করতে হয়। করোনা ভাইরাসের কারণে ছেলে মেয়েদের স্কুল বন্ধ থাকায় তারাও আমাদের এ কাজে সহযোগিতা করছে বলেই একটু বেশি ডালা বুনতে পারায় উপার্জন একটু বেড়েছে।

এ কাজে আয় রোজগার বেশী মনে হলেও আরেকটা সমস্যা আছে। সেটা হলো আমরা যাদের কাজ করি তারা আমাদের সপ্তাহের টাকা সপ্তাহে দিতে পারেনা। এতে করে আমাদের খুবই সমস্যায় পড়তে হয়। সরকার যদি এসকল কন্ট্রাক্টরদের কিছু টাকা ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করতো তাহলে তাদের দ্বারা আমরাও স্বাবলম্বী হতাম। কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে টাকা পেতাম।

এই এলাকায় দায়িত্বে থাকা ছোনের ডালার কন্ট্রাক্টর আব্দুস সালামের সাথে কথা হলে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের নিজের পুঁজি খাটিয়ে ডালা বুনানোর উপকরণ কিনতে হয়। যারফলে, প্রতিনিয়ত আমরা আর্থিক সংকটে পড়ে থাকি। আর তাই মাঝে মাঝে উদ্যোক্তা নারীদের সপ্তাহের টাকা সপ্তাহে দিতে আমরা হিমশিম খাই। তাছাড়া যাদের সরকারি সুবিধা পাওয়ার কথা তারা পায় না। পাচ্ছে ঢাকার বড় বড় মহাজনরা। অথচ যাদের হাতের ছোঁয়ায় দেশের এই প্রাপ্তি তারা হচ্ছে বঞ্চিত। আমরা চাই সরকার এ দিকে দৃষ্টি দিক।

এ উপজেলায় এ কাজগুলোর পণ্য সংগ্রহ করে এমন ছয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো- সান ট্রেড, ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রডাক্টস্ বিডি, ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফ্ট, এএসকে হ্যান্ডিক্রাফ্ট, ক্রাফ্ট ভিলেজ এবং ক্রিয়েটিভ বিডি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র বগুড়া থেকে মাসে দুই কোটি টাকার বেশি পণ্য উৎপাদন করে থাকে।

বিডি ক্রিয়েশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আহমেদ পিয়াস বলেন, তারা দুই শত বিভিন্ন ধরনের পণ্য বগুড়া থেকে উৎপাদন করেন এবং এগুলো অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, সুইডেন, ডেনমার্ক সহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে ও চীন, ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেন।

তিনি বলেন, আমরা অর্ডার পাওয়ার জন্য জার্মানির একটি ও হংকংয়ের দুইটি মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। সেখানে বিশ্বের বড় বড় ক্রেতারা অংশগ্রহণ করেন। এক হাপুনিয়া গ্রামেই ছয়টি কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে- দুইটি বিডি ক্রিয়েশনসের, তিনটি ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড এবং একটি সান ট্রেডের।

এ প্রসঙ্গে শেরপুর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী সেখ বলেন, এই উপজেলায় যারা নারী উদ্যোক্তা আছেন তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ের উপর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা প্রশিক্ষন পায় নাই পর্যায়ক্রমে তাদেরকেও প্রশিক্ষনের আওতায় এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া, সরকারি ভাবে যে সকল প্রকল্প দেয়া হয় প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের মাঝে তা বন্টন করা হবে। অন্যদিকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী উদ্যোক্তাদের উপর খুব গুরুত্ব দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *