গর্ভধারণের ৯ম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ

দেশজুড়ে লাইফ স্টাইল

মার্জিয়া ইসলাম:

আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি- গর্ভধারণের ৯ম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ নিয়ে। চলুন তবে শুরু করা যাক।

গর্ভধারণের নবম সপ্তাহে এসে গর্ভবতী মা এবং গর্ভস্ত সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত চলতে থাকে। ঠিক এ সময়েও- গর্ভবর্তী মা’কে বাইরে থেকে দেখতে প্রেগন্যান্ট মায়েদের মত মনে না হলেও- তার শারীরীক ও মনের পরিবর্তনগুলো বেশ লক্ষ্যনীয়।
গর্ভাবস্থার এ সময়ে এসে আপনার ওজন খুব বেশী না বাড়লেও- বিশেষত কোমরের কাছে কাপড় আঁটসাঁট বলে মনে হতে পারে। পাশাপাশি তলপেটে চাপ অনুভূত হওয়ার সাথে সাথে আপনার ক্লান্তবোধ লাগতে পারে। এই পরিস্থিতিগুলোকে কোন সমস্যা ভাববেননা। কারণ, এই পরিবর্তনগুলো- আপনার শরীরে জন্ম নেয়া প্রেগন্যান্সি হরমোন সৃষ্টির কারণেই হয়ে থাকে।

৯ম সপ্তাহে গর্ভাবস্থার লক্ষণ
গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে শরীরে প্রজেস্টরন হরমোন বৃদ্ধির ফলে ক্লান্তি লাগা, দুর্বল লাগা, পেটে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। এ সমস্যাগুলো গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে এসে একটু কমলেও শেষের দিকে গিয়ে আবার বৃদ্ধি পেতে পারে।

এছাড়াও, গর্ভকালীন স্রাব, প্রদাহ, হলুদ বর্ণের তরল নির্গত হতে পারে। অন্যদিকে আপনি যত সৌন্দর্য সচেতন-ই হোন না কেন- এসময় আপনার মুখে ব্রন দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই ব্রণ সাড়াতে গিয়ে মুখে কোন কিছু ব্যবহারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন আবশ্যক। কারণ, গর্ভধারণের সময় কিছু কিছু ক্রীম ব্যাবহার আপনার সন্তানের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এসময় প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস নামক- নাক বন্ধ হওয়া সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত ঠাণ্ডা লাগলে আমরা যে সমস্যার সম্মুখীন হই- প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিসে ঠিক এমনই হয়ে থাকে। গর্ভকালীন সময়ে হরমোনের পরিবর্তনের ফলে এ উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে। সাধারণত গর্ভধারণের দ্বিতীয় মাস থেকে এ সমস্যা শুরু হলেও পরবর্তীতে আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

গর্ভধারণের নবম সপ্তাহে এসে অনেক মায়েদের ক্ষেত্রেই বরফ, আচারসহ নানা খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছার পাশাপাশি- মাটি, ছাই ইত্যাদি অখাদ্য খাওয়ারও তীব্র ইচ্ছা হতে পারে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে পছন্দের বিশেষ খাবারগুলোও এসময় অসহ্য লাগতে পারে। অনেকে আবার এসময় মাথাব্যথা, বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে ব্যাথা এবং পিঠ ব্যথার সমস্যায় ভুগে থাকেন।

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভধারণের নবম সপ্তাহে এসে আপনার গর্ভে বেড়ে ওঠা ভ্রুনটি ধীরে ধীরে মানবশিশুর রুপ নিতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় তার চেহারায় পুর্ণাঙ্গ মানবরুপ ফুটে উঠছে। ভ্রুণের সাথে থাকা লেজ সদৃশ্য অংশটি একেবারেই মিলিয়ে যেতে বসেছে।

এসময় জিহ্বাটি আকৃতি লাভ করার সাথে সাথে এর স্বাদগ্রন্থিও তৈরি হয়। পাশাপাশি কানগুলোর ভেতর এবং বাইরের আলাদা কাঠামো দেখা দিতে শুরু করে । চোখগুলো কিছুটা বড় এবং স্পষ্ট হয়ে ওঠার সাথে সাথে নিজস্ব বর্ণ ধারণ করে। ভ্রূণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, কিডনি এবং পরিপাকতন্ত্রের গঠন এখনো চলমান।

আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে এ সপ্তাহেও শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব নয়। এরজন্য আপনাকে ১৫ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। যদিও, আপনি গর্ভাবস্থার নবম সপ্তাহে অবস্থান করছেন কিন্তু, বিকাশের দিক দিয়ে আপনার গর্ভের শিশু আছে সপ্তম সপ্তাহে। বর্তমানে আপনার গর্ভস্ত শিশুর আকার- একটি জলপাইয়ের সমান ।

এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় শরীর চর্চার ব্যাপারে বলা হলেও কোন ব্যায়ামটি করবেন আর কোনটি করবেননা তা ভালভাবে জেনে নিন। না জেনে শরীর চর্চা করলে- সেটি আপনার এবং সন্তানের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।

গর্ভধারণকালীন সময়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। মন ভালো এবং হাসি খুশী থাকার চেষ্টা করুন। আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর সঠিক বৃদ্ধির জন্য আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার রাখুন।

গর্ভাবস্থায় অনেকেরই মাড়ি ফুলে রক্তপাত হতে দেখা যায়- এক্ষেত্রে মাড়ির সঠিক যত্ন নিতে প্রতিদিন সকালে এবং রাতে শোবার আগে দাঁত ব্রাশ করে নিন। এক্ষেত্রেও সমাধান না মিললে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ২০ ভাগ গর্ভধারণের ক্ষেত্রে প্রথম দিককার সপ্তাহগুলোতে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। আর তাই অধিক রক্তপাত, অস্বাভাবিক ডিসচার্জ, তলপেটে মাত্রাতিরিক্ত ব্যাথাজনিত বা যে কোন ধরনের নির্গমন অতিরিক্ত মনে হলে সাথে সাথে ডাক্তারকে অবহিত করুন।

অন্যদিকে, শতকরা ত্রিশ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণের পর প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস নামক নাক বন্ধ হওয়া সমস্যা দেখা যায়। এই সমস্যা গর্ভধারণের দ্বিতীয় মাস থেকে শুরু হলেও এটা প্রায় গর্ভধারণের পুরো সময় জুড়ে আরো তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। তবে, এতে খুব বেশী চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, সন্তান প্রসবের পরপরই এই সমস্যা কিছুটা প্রশমিত হয় এবং প্রসবের পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যেই একেবারে ঠিক হয়ে যায়।

আগেই বলা হয়েছে এসময় আপনার অখাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তিনি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকলে তা খুঁজে বের করবেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। কারণ, অনেক সময় শরীরে আয়রন বা অন্য কিছুর ঘাটতি থাকলে এমনটি হতে পারে।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পরবর্তী ভিডিওতে সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা সিরিজের ১০ম সপ্তাহের লক্ষণ ও পরিবর্তন নিয়ে- আপনাদের সামনে হাজির হবো।

ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *