গর্ভধারণের ১১তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ

দেশজুড়ে লাইফ স্টাইল

মার্জিয়া ইসলাম:
আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি- গর্ভধারণের ১১তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ নিয়ে। চলুন তবে শুরু করা যাক।
গর্ভধারণের ১১তম সপ্তাহে এসে গর্ভবতী মা এবং গর্ভস্ত সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত চলতে থাকে। ঠিক এ সময়েও- গর্ভবর্তী মা’কে বাইরে থেকে দেখতে প্রেগন্যান্ট মায়েদের মত মনে না হলেও- তার শারীরীক ও মনের পরিবর্তনগুলো বেশ লক্ষ্যনীয়। একাদশ সপ্তাহ মানে আপনি ইতিমধ্যে দুই মাস দুই সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট।

আপনাকে দেখে এখনো প্রেগন্যান্ট মায়েদের মত মনে না হলেও আপনি মনে মনে আপনার অনাগত সন্তানের কথা ঠিকই ভাবা শুরু করে দিয়েছেন। গর্ভধারনের শুরু থেকেই মায়ের সাথে গর্ভস্থ সন্তানের- বন্ধনের ভিত গড়ে উঠলেও এসপ্তাহ থেকে তা আরো বেশী দৃঢ় হতে শুরু করে।

১১তম সপ্তাহে গর্ভাবস্থার লক্ষণ

গর্ভধারণের এগারোতম সপ্তাহে এসে আপনার পেটের আকারে তেমন কোন পরিবর্তন না এলেও এই সপ্তাহে আপনার কোমর কিছুটা ভারী হওয়া শুরু করবে। আপনার পেটের আকার বাড়ার সাথে সাথে শরীরের পেশী এবং লিগামেন্টগুলোতে টান লাগার ফলে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন হতে পারে। এ ব্যাথা দুপাশেই হওয়ার প্রমাণ মিললেও ডান পাশে বেশী হয়ে থাকে। এ ব্যথা আপনার উরু পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তবে ব্যাথা যদি খুব তীব্র মনে হয় তাহলে ডাক্তারকে জানানো উচিত।

গর্ভধারণের কারণে সময়ে সময়ে আপনার শরীরে নানা ধরনের হরমোনের পরিবর্তনের ফলে শরীরে রক্তের পরিমাণ এবং ওজন বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এর ফলে আপনার শরীরের তাপমাত্রা বেশী বলে মনে হতে পারে। তবে এমন অবস্থাতেও চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। ১১তম সপ্তাহে এসে বেশিরভাগ মায়েদের ক্ষেত্রে বিগত সপ্তাহগুলোর চেয়ে মর্নিং সিকনেসের প্রবণতা কমতে থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এসময় মর্নিং সিকনেস একইরকম কিংবা আরও বাড়তে পারে। তবে, এমন মায়েদের সংখ্যা খুবই কম।

গর্ভাবস্থার ১১তম সপ্তাহে গর্ভবতী মায়ের জরায়ুর আকার এবং শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার ফলে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল স্বাভাবিকের চাইতে আস্তে হয়। এ কারনে পায়ে ইডেমা বা পানি ধরা সমস্যার পাশাপাশি ক্র্যাম্পও হতে পারে। অন্যদিকে, শরীরের নানা হরমোনের পরিবর্তন বা আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেয়ার কারণেও এসময় কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। হরমোনের কারণে মায়েদের শরীর ও পরিপাকতন্ত্রের পেশিগুলো শিথীল হয়ে পড়ায় খাবার হজম ধীরে হওয়ায় পেশীতে শিথিলতা দেখা দেয়ার সাথে সাথে বায়ু ত্যাগ নিয়ন্ত্রন কষ্টকর হয়ে ওঠে।

গর্ভাবস্থার ১১তম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভধারণের এগারোতম সপ্তাহে এসে আপনার গর্ভের ভ্রূণ তার শরীরকে কখনো কখনো টান টান করছে আবার কখনো কখনো উল্টেপাল্টে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই সময়ে আপনার গর্ভস্থ ভ্রূণটির আকার একটি ছোট লেবুর সমান। যা লম্বায় প্রায় ১ দশমিক ৬ ইঞ্চির মত। গর্ভাবস্থার ১১তম সপ্তাহে এসে ভ্রূণের গুরুত্বপূর্ণ সকল অঙ্গগুলো তার সঠিক অবস্থানে চলে আসে। এবং বেশীরভাগ অঙ্গগুলোই তাদের নিজ নিজ কাজও শুরু করে দেয়।

আর ফিটাল পিরিয়ডে এসে ভ্রূণের শারিরীক বৃদ্ধির সাথে সাথে গঠিত হওয়া অঙ্গগুলোর পরিপূর্ণ বিকাশ হতে থাকে। এই সময়ে এসে শিশুর মাথা এবং পুরো শরীর জুড়ে চুলের গোড়া বা হেয়ার ফলিকলের গঠন শুরু হওয়ার সাথে সাথে ভ্রূণের কান তাদের সঠিক যায়গায় অর্থাৎ মাথার ঠিক দুই পাশে নিজেদের অবস্থান পাকা করে নেয়।

নাকের ছিদ্রগুলো পুরোপুরি খুলে যায় এবং জিহ্বা দৃশ্যমান হওয়া শুরু করে। জন্মের ৭-৮ মাসের আগ পর্যন্ত শিশুর দাঁতগুলো দৃশ্যমান না হলেও ১১তম সপ্তাহ থেকেই গর্ভস্থ শিশুর দুই মাড়ির নিচে তার বিশটি দাঁতের গঠন শুরু হয়ে যায়। এ পর্যায়ে এসে শিশুর জোড়া লেগে থাকা হাত পায়ের আঙ্গুল গুলো আলাদা হতে থাকে এবং নখের বিকাশ শুরু হওয়ার সাথে সাথে শরীরের হাড়গুলো আরও শক্ত হয়। এছাড়া এই সময়ে ভ্রূণের রগ, শিরা এবং ধমনী ধীরে ধীরে গঠিত হওয়া শুরু করে।

সাধারণত গর্ভধারণের ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহের আগে বেশিরভাগ মা-ই তার গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়া অনুভব করতে পারেন না। যদিও এ সপ্তাহ থেকেই বাচ্চা তার হাত পা ছুড়াছুড়ি করতে শুরু করে থাকে।আর এটা যদি প্রথম সন্তান হয়ে থাকে তাহলে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে, আপনার গর্ভস্থ শিশুটির চোখ এসপ্তাহে এসে বন্ধ থাকলেও সেটা কিন্তু মোটেও ঘুমন্ত নয়। অন্যদিকে, এ সময়ে শিশুর ডায়াফ্রাম গঠিত হয়ে যায় বলে শিশু হেঁচকিও দিয়ে থাকে।

এ ১১তম সপ্তাহে করনীয়

এ সপ্তাহের শেষে এসে আপনাকে আর বাড়তি ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করতে হবেনা, কারণ ইতিমধ্যে আপনার শিশুর নিউরাল টিউবের গঠন সম্পন্ন হয়েছে। তবে সামনের দিনগুলোতে আপনার বাড়তি ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন না হলেও ফলমূল, এবং বিচিজাতীয় খাবার খাওয়ার দিকে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।

এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে দিনে অন্তত সাত থেকে আট গ্লাস পানি পান করার সাথে সাথে আঁশযুক্ত খাবার যেমন- শাকসবজি, ডাল, আটা গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন গর্ভকালীন সময়ে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতে বা অন্য যেকোন সমস্যায় ওষুধ গ্রহণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া আবশ্যক।

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস এবং শেষের তিন মাসে- আপনার শরীরের ক্ষমতার তুলনায় ভারি কাজ এড়িয়ে চলুন। ঝুঁকে বা নুয়ে করা কাজগুলো ত্যাগ করুন এবং হাঁটা চলায় সাবধান থাকুন। গর্ভাবস্থার ১১তম সপ্তাহে এসে গর্ভপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। সুতরাং দুশ্চিন্তা পরিহার করুন। সেইসাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কর্তব্য হলো শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য গর্ভবতী মাকে সর্বদা হাসিখুশি ও চাপমুক্ত রাখা এবং যথাযথ মানসিক সাপোর্ট দেয়া।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পরবর্তী ভিডিওতে সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা সিরিজের ১২তম সপ্তাহের লক্ষণ ও পরিবর্তন নিয়ে- আপনাদের সামনে হাজির হবো। ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *