গর্ভধারণের ১২তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ

দেশজুড়ে লাইফ স্টাইল

মার্জিয়া ইসলাম:
আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি-গর্ভধারণের ১২তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ নিয়ে। চলুন তবে শুরু করা যাক। ১১ সপ্তাহ পার হওয়া মানে ইতিমধ্যে আপনি গর্ভধারণের প্রায় প্রথম তিনমাসের শেষদিকে চলে এসেছেন। এ সপ্তাহেও আপনার শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো চলমান রয়েছে। তবে গর্ভধারণের ১২তম সপ্তাহে এসে হরমোনগত বেশ কিছু পরিবর্তন কমে আসে। যার ফলে, অনেক মায়েদের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি কমে আসার সাথে সাথে শরীর অনেকটা অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এতদিন হবু মাকে দেখে প্রেগন্যান্ট মায়েদের মত মনে না হলেও এখন তার শারীরিক পরিবর্তনগুলো বাইরে থেকে বেশ ভালভাবেই বোঝা যাবে। লক্ষণের পাশাপাশি শারীরিক পরিবর্তনেও আপনার গর্ভবতী হওয়ার চিত্র ফুটে ওঠায় আপনাকে অভিনন্দন।

১২তম সপ্তাহে গর্ভাবস্থার লক্ষণ

গর্ভধারণের ১২ তম সপ্তাহে এসে কিছু কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে মাথা ব্যাথা বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে হরমোনের পরিবর্তনের ফলে ক্লান্তি লাগা, ক্ষুধা, পানিশূন্যতা, মানষিক চাপ ইত্যাদি সমস্যা চলতেই থাকবে। খুশির খবর হলো এসময়ে এসে মায়ের জরায়ুর অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে ব্লাডারের উপর চাপ কিছুটা কমে যায়। যারফলে, গর্ভবতী মায়েদের ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়ার চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে।

এ সপ্তাহে এসে গর্ভবতী মায়েদের শারিরীক পরিবর্তনের সাথে সাথে কোমরের আকার বেড়ে যায়। এর ফলে কিছুদিন আগে বানানো পরনের কাপড়গুলোও এসময় থেকে কিছুটা টাইট মনে হতে পারে।

অন্যদিকে, এসময় গর্ভবতী মায়েদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের ফলে ত্বকে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসময় হঠাৎ করেই আপনার মুখে বা গলায় কালো বা বাদামী রঙের ছোপ ছোপ দাগ দেখা দিতে পারে। দেখা গেছে, গর্ভবতী প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ মায়েরাই এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে এতে খুব বেশী চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

গর্ভাবস্থার ১২তম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

বিগত সপ্তাহগুলোর মতই গর্ভধারণের ১২তম সপ্তাহ, আপনার গর্ভস্থ ভ্রূ ভ্রূণের বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সপ্তাহে এসে বাচ্চার সব অঙ্গ গঠিত হওয়ার সাথে সাথে অঙ্গগুলোর পরিপূর্ণতাও চলে আসে।

তবে, ১২তম সপ্তাহে বাচ্চার সবগুলো তন্ত্রের বাহ্যিক গঠন অনেকাংশে সম্পূর্ণ হলেও অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো নিজ নিজ কাজ শুরু করতে আরো কিছুটা সময় বাকি। ভ্রূণের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ কাজ শুরু করতে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিবে।

গর্ভধারণের ১২ তম সপ্তাহে এসে আপনার শিশুটির আকার একটি বড় সাইজের বড়ইয়ের সমান। যা লম্বায় প্রায় ২ দশমিক ১৩ ইঞ্চির মত। গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভস্থ শিশু তার পা দু’টোকে পেটের সাথে গুটানো অবস্থায় রাখে।
গর্ভধারণের ১২ তম সপ্তাহে এসে আপনার গর্ভস্থ শিশু তার হাত পায়ের আঙ্গুলগুলো খোলামেলা ও বাঁকা করতে পারে, সাথে সাথে চোখের পাতা মিটমিট করার পাশাপাশি তার দুই ঠোঁট দিয়ে চোষার মত ভঙ্গি করতে পারে।

অন্যদিকে, ১২ তম সপ্তাহ থেকেই আপনার গর্ভস্থ ভ্রূণের শরীরে ধূসর বর্ণের চুল দৃশ্যমান হতে পারে এবং ভ্রূণের ভোকাল কর্ডের গঠন ও শুরু হয় । তাছাড়াও, ভ্রূণের চেহারায় মানবশিশুর রুপ আরো স্পষ্টভাবে আকার ধারণ করার সাথে সাথে ভ্রূণের বোন ম্যারো শ্বেত রক্ত কণিকা তৈরি শুরু করে।

বর্তমানে ভ্রূণের মাথার আকার তার পুরো শরীরের অর্ধেক। এসময় থেকেই শিশুর মুখের লালা গ্রন্থির কাজ শুরু হয়ে থাকে এবং ফুসফুসের বিকাশের সাথে সাথে ভ্রূণ তার নিঃশ্বাসের মাধ্যমে অ্যাম্নিওটিক ফ্লুয়িড গ্রহন ও ত্যাগ করা শুরু করে।

১২ তম সপ্তাহ পর্যন্ত ভ্রূণের পেটে জায়গা কম থাকায় তার নাড়িভুঁড়ি গুলো অ্যাম্বিলিকাল কর্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এ সপ্তাহে এসে সেগুলো তাদের নির্দিষ্ট স্থানে চলে যায়। অন্যদিকে, ১২তম সপ্তাহ থেকেই বাচ্চা অ্যাম্নিওটিক ফ্লুয়িড গ্রহন করায় তা কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবে রূপান্তরিত হয়ে ব্লাডারে জমা হয় এবং এ সময় থেকেই ভ্রূণের কিডনিও তার কাজ শুরু করে।

এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থার ১২তম সপ্তাহে এসে আলট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেয়া হতে পারে । কারণ, এসময়ে এসে গর্ভপাতের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। মজার বিষয় হলো অনেক মায়েদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় পেটের আকার নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় থাকেন। তাদের জন্য পরামর্শ হলো এবিষয়ে কখনো কারোর সাথে নিজেকে তুলনা করবেন না। কারণ, গর্ভাবস্থায় মায়ের পেটের আকার কেমন হবে তা আপনার হরমোনগত অবস্থা, গর্ভাবস্থার আগের ওজন, কততম গর্ভাবস্থা, আপনার পেটের পেশীর গঠনসহ আরো নানা বিষয়ের উপর নির্ভর করে। অন্যের সাথে তুলনায় আপনার পেটের আকার ছোট বা বড় বলে মনে হলে আপনার কোন সমস্যা রয়েছে এমনটি ভাবা নিতান্তই বোকামী।

প্রথম আলট্রাসাউন্ড করার সময় শিশুর বাবার উচিত সম্ভব হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া। তাহলে গর্ভাবস্থার খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে একসাথে দু’জনে জানতে পারবেন এবং স্ত্রীকে সাহস ও সহযোগিতা করতে পারবেন।

গর্ভাবস্থার এই সময় থেকেই কেগেল ব্যায়াম শুরু করার উপযুক্ত সময়। এই ব্যায়ামে গর্ভকালীন অতিরিক্ত ওজন বহন করার শক্তি পাওয়া যায় এবং পেশীগুলো সন্তান প্রসবে উপকারী ভূমিকা পালনে গঠিত হয়। তবে, ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেয়া জরুরী।

গর্ভাবস্থায় ডায়েটের ব্যাপারে সচেতনতা জরুরী। আর এই ১২ তম সপ্তাহই ব্যালান্সড ডায়েট শুরু করার সঠিক সময়। এ ব্যাপারে একজন বিশেষজ্ঞের সাথে সাথে আলাপ করে নিতে পারেন।

এছাড়াও নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন। কারণ গর্ভাবস্থায় বেশী বেশী পানি পান কোষ্ঠকাঠিন্য, ব্লাডার ইনফেকশনসহ অর্শরোগের মত কিছু কমন সমস্যা থেকে আপনাকে মুক্তি দিবে।

গর্ভাবস্থায় ওজন যাতে খুব বেশি বেড়ে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে । কারণ, এ অবস্থায় ওজন খুব বেশি বেড়ে গেলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যাক পেইনসহ পায়ে ব্যাথার মত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পরবর্তী ভিডিওতে সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা সিরিজের ১৩তম সপ্তাহের লক্ষণ ও পরিবর্তন নিয়ে- আপনাদের সামনে হাজির হবো। ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *