গর্ভধারণের ১৩তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ

দেশজুড়ে লাইফ স্টাইল


মার্জিয়া ইসলাম:

আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি-গর্ভধারণের ১৩তম সপ্তাহের লক্ষণ, উপসর্গ, শিশুর বৃদ্ধি ও কিছু পরামর্শ নিয়ে। চলুন তবে শুরু করা যাক।

আপনি এখন গর্ভধারনের ১৩তম সপ্তাহে অবস্থান করছেন। অন্য সময়ের তুলনায় এখন থেকে আপনাকে একটু বেশীই চিন্তিত মনে হতে পারে। কারণ, এসময় অধিকাংশ মায়েরাই একদিকে নতুন শিশুর আগমন নিয়ে খুশী, অন্যদিকে মুড সুইং নিয়ে বিব্রত অবস্থায় থাকেন। প্রথম বাচ্চার বেলায় যেমন আগ্রহ/উত্তেজনা কাজ করে, দ্বিতীয় বা তার পরের বাচ্চার বেলায়, নতুন বাচ্চার চিন্তার সাথে সাথে আগের বাচ্চাদের দেখাশোনার বিষয়টি মা’কে চিন্তিত করে তোলে।

১৩তম সপ্তাহে এসে আপনি আরো বেশকিছু শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। এসময় প্রথমদিকের তুলনায় আপনার ক্লান্তি লাগার প্রবণতা একদমই কমে আসবে। অনেকের ক্ষেত্রেই এসময় সহবাসের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যেতে পারে।

১৩ তম সপ্তাহে গর্ভাবস্থার লক্ষণ

গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহকে গর্ভকালীন সময়ের সবচেয়ে সহজ ও আরামদায়ক সময় বলা হয়ে থাকে। কারণ, এ সময় থেকেই গর্ভবতী মায়েদের মর্নিং সিকনেস, বমি বমি ভাবসহ খারাপ লাগার মত নানা উপসর্গ কমতে থাকে। মর্নিং সিকনেস কমে আসার ফলে এসময় মায়েদের ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে। সাধারণত এসময় থেকেই বেশিরভাগ মায়েরা সতেজ বোধ করে থাকেন।

অন্যদিকে, মায়ের ব্লাডারের উপর থেকে জরায়ুর চাপ কমতে থাকায় ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়ার বেগ কমতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে মর্নিং সিকনেস এবং ক্লান্ত লাগার সমস্যা চতুর্থ বা পঞ্চম মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। আবার খুব অল্প কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে তা পুরো গর্ভাবস্থা জুড়েই চলতে পারে।

এই সময়ে ডিসচার্জ বা সাদা স্রাব নির্গত হওয়ার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। বিষয়টি অস্বস্তিকর হলেও এর বিশেষ কিছু উপকারী দিকও রয়েছে। এই ডিসচার্জ আপনার শরীরকে বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশন থেকে রক্ষা করার সাথে সাথে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখে।

এ সময় মায়েদের স্তন থেকে হলদেটে বা কমলা রঙের তরল নিঃসৃত হয় যা কোলোস্ট্রাম, বা শালদুধ নামে পরিচিত । এই নির্গত হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হওয়াও উচিত নয়। কারণ, গর্ভাবস্থায় এটি অতি সাধারণ উপসর্গ।

গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহে এসে বাচ্চার মাথার আকার পরিবর্তন হয়ে শরীরের সমঅনুপাতিক হতে শুরু করে। এই সপ্তাহের শেষ নাগাদ ভ্রূণের মাথা তার শরীরের আকারের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, শিশুটির নিজস্বতায় প্রতীক হিসেবে তার আঙ্গুলের ছাপও স্পষ্ট হতে শুরু করে।

গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহ থেকেই মেয়ে ভ্রূণের ডিম্বাশয় এবং ছেলে ভ্রূণের শুক্রাশয় পুরোপুরি গঠিত হলেও আলট্রাসাউন্ডে তা ধরা পড়বেনা। কারণ সেগুলোর আকার এখনও খুবই ছোট।

কিছু কিছু ভ্রূণ এই সময় থেকেই তার বৃদ্ধাঙ্গুল চোষা শুরু করে থাকে। এসময় ভ্রূণের মাথা, হাত ও পায়ের দিকের টিস্যুগুলো ধীরে ধীরে হাঁড়ে রূপান্তরিত হতে থাক। যদিও আপনার গর্ভস্থ শিশুটির আকার এখন একটি লেবুর সমান। তারপরও এই ছোট্ট শরীরের ভ্রুণটি এখন অনেক কিছুই করতে শিখেছে।

এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে, এসময় জীবাণু সংক্রমণ এড়াতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস করুন, অসুস্থ মানুষজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা এড়াতে প্রচুর পরিমানে পানি পান করার সাথে সাথে ওটসকে খাবার তালিকায় সঙ্গী করে নিন।

যেহেতু এসময় বাচ্চার হাড় ও দাঁতের গঠন চলতে থাকে তাই ডায়েটে দুধ, মাছ, বাদাম, কমলালেবু ইত্যাদি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে ১০০০ হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের উৎস হিসেবে সবুজ শাক-সবজি, ফুলকপি খাওয়া যেতে পারে। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। আর যাদের দুধ খেতে সমস্যা দই খাওয়া তাদের জন্য সবচেয়ে উত্তম সমাধান।

এ সময় হাঁটা চলা অব্যাহত রাখুন। একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকা পরিহার করুন। তিন বেলা প্রধান খাবারের মাঝে ক্ষুধা পেলে ফলের সালাদ খাওয়ার চেষ্টা করুন, এতে করে আপনার সুষম খাবারের চাহিদা পূর্ণ হয়ে যাবে। একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, এ সময় যদি মুত্রত্যাগে অধিক ব্যাথা অনুভূত হয় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানান।

তাছাড়াও, এসময় আপনার শরীর থেকে নির্গত হওয়া কোলোস্ট্রাম, বা শালদুধ যদি পুঁজের মত মনে হয় অথবা ব্যাথা অনুভূত হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহে এসে আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে বাচ্চার ওজন ও উচ্চতা জানা যায়। এক্ষেত্রে আপনার জন্য পরামর্শ হলো অন্যের রিপোর্টের সাথে নিজের তুলনা পরিহার করুন। কারণ, এসময় থেকে প্রতিটি ভ্রূণ তার নিজস্ব গতিতে বাড়তে থাকে । কারোর বৃদ্ধি দ্রুত, আবার কারোরটা হয় ধীরগতির। তবে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে গিয়ে বেশিরভাগ ভ্রূণই তার প্রয়োজনীয় ওজন ও উচ্চতা লাভ করে থাকে।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পরবর্তী ভিডিওতে সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা সিরিজের ১৪তম সপ্তাহের লক্ষণ ও পরিবর্তন নিয়ে- আপনাদের সামনে হাজির হবো। ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *