ডা. রায়হান পিএএ’র ব্যাতিক্রমী পাঠশালা; দেশি মুরগী পালনে সাবলম্বী হচ্ছে দেশের শিক্ষিত বেকার

প্রধান খবর বগুড়ার সংবাদ

এস, আই শাওন:

ঘড়িতে সময় রাত ১১ টা। রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক ছোট ট্রাক। ট্রাকগুলোতে তোলা হচ্ছে খাঁচি। না। এটি ডিম বা লাচ্ছা সেমাইয়ের খাচি নয়। ট্রাকে বোঝাই করা খাঁচিতে রয়েছে দেশি মুরগী। হ্যাঁ। এমনই চিত্র বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের বাসষ্ট্যান্ড (সাবেক ইসলামী ব্যাংক হাইওয়ে শাখা)’র সামনের রাস্তার। এখান থেকেই প্রতি রাতেই দেশি মুরগির খাচি বোঝাই করা গাড়িগুলো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোটে।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকেই বোঝা যায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার উদ্যোক্তারা দেশি মুরগি চাষে ঝুঁকেছেন। এ উপজেলার উদ্যোক্তাদের মাঝে এ ঝোঁক আপনা-আপনি আসেনি। ঝোঁকের পেছনে রয়েছে এক পাঠশালার নিরব ভূমিকা। মুরগী চাষে পাঠশালার ভূমিকা? এটি আবার কেমন কথা! হ্যাঁ। এ উপজেলায় দেশী মুরগী চাষে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ’পাঠশালা’। এ পাঠশালার উদ্ভাবক শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা.মো.রায়হান পিএএ ।

ডা. মো. রায়হান ২০১৫ সালে ভোলার মনপুরা উপজেলা থেকে বদলী হয়ে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগদান করেন। এ উপজেলায় এসে জানতে পারেন স্থানীয় আমজাদ হোসেন, আবদুল কাদের ও এনামুল হক তাঁদের বাড়িতে সনাতন পদ্ধতিতে ৫০-৬০টি করে দেশি মুরগি পালেন। তিনজনকে নিজ অফিসে ডেকে আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে দেশি মুরগির খামার করার কথা বলেন, তাদের সায় থাকায় করেন প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা। অল্প দিনেই সফল হন তাঁরা। তাঁদের সফলতার কথা ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপজেলায় । শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে উদ্যোক্তাদের হিড়িক পড়ে যায়।

ডা. মো. রায়হান তাদের মাঝে স্বপ্ন দেখেন অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড (হরমোন) ধরনের ওষুধ ব্যবহারমুক্ত দেশী মুরগীর। স্বপ্নকে বাস্তবতায় রুপ দেন স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি নামক পাঠশালা স্থাপনের মাধ্যমে। উপজেলা শহরের টাউন কলোনি এলাকায় ‘উদ্যোক্তা পাঠশালা’ চালু করেন তিনি। আগ্রহী ১৫ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এ পাঠশালার যাত্র শুরু হয়। অল্প দিনে তাঁরাও সফল হন।

প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যস্ত ’স্বপ্ন ছোঁয়ার সিড়ি’ পাঠশালার উদ্ভাবক শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা.মো.রায়হান পিএএ ।

দেশজুড়ে এ উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে। দেশব্যাপী শিক্ষিত বেকারদের মাঝে এ পাঠশালার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের চকপাথালিয়া গ্রামে গড়ে তোলেন আরেকটি শাখা। সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার সারা দেশ থেকে আসা উদ্যোক্তাদের নিয়ে চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এ পাঠশালায় অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়ড ব্যবহার না করেই দ্রুত সময়ে দেশি মুরগির অধিক মাংস ও ডিম উৎপাদন, বাণিজ্যিক খামার গড়া ও বাজারজাতকরণের নানা কৌশল শেখানো হয় হাতে কলমে।

ইতিমধ্যে, ভেটেরিনারি সার্জন ডা.মো.রায়হান পিএএ’র ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি’ নামক পাঠশালা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ধড়মোকাম গ্রামের জাকারিয়া ইসলাম (২২) একজন সফল খামারির খেতাব পেয়েছেন। সবেমাত্র তিনি সরকারি আজিজুল হক কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে গত ১৯ (ফেব্রুয়ারী) শুক্রবার স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি প্রাণিসম্পদ উদ্যোক্তা পাঠশালায় গিয়ে দেখা যায় পুরোদমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালি থেকে ইনাম ইলাহী চৌধুরী, যশোরের অভয় নগরের হোসনে আরা, আবিদ হাসান, কুমিল্লার দেবিদ্বারের আকরাম হোসেন, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার আসিফ, টাংগাইলের মধুপুর ভুয়াপুরের ফরিদ, সাবির দেওয়ানসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে এসব তরুন উদ্যোক্তারা। প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মোহা.রফিকুল ইসলাম তালুকদার,উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মো. আমিরহামজা,সালেহ আল রেজা, ভেটস সোসাইটি বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক তাওহিদুল ইসলাম। করোনার প্রকোপ কমায় আবারও প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি প্রাণিসম্পদ উদ্যোক্তা পাঠশালায়। দেশি মুরগির বাণিজ্যিক অরগানিক চাষ ও প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত খামারভিত্তিক এ পাঠশালা থেকে এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে প্রায় তিন হাজার উদ্যোক্তাকে।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মোহা.রফিকুল ইসলাম তালুকদার,উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মো. আমিরহামজা,সালেহ আল রেজা, ভেটস সোসাইটি বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক তাওহিদুল ইসলাম।

দেশি মুরগির জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং স্বল্প বিনিয়োগে উদ্যোক্তা তৈরিতে অবদান ও জনসেবায় অনবদ্য ভূমিকা রাখায় মো. রায়হান ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে (ব্যক্তিগত শ্রেণি) জনপ্রশাসন পদক পেয়েছেন। (আর-৬২) তম বুনিয়দী প্রশিক্ষণে ২য় স্থান অর্জন করায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে স্বর্ণপদক পেয়েছেন।

নাগরিক সেবায় শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনী কর্মকর্তার স্বীকৃতিস্বরুপ ২০১৯ সালে বগুড়া জেলা প্রশাসন ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও পদক অর্জন করেছেন। একই বছর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের পক্ষ থেকে ইনোভেশন শোকেসিং শ্রেষ্ঠ পাইলটিং উদ্যোগ নির্বাচিত হন।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালি থেকে প্রশিক্ষণ নিতে আসা ইনাম ইলাহী চৌধুরী বলেন, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের যোগান নিশ্চিত, এবং নিজের কর্মসংস্থান ও দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে এ প্রশিক্ষণ নিতে এসেছি।

শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. রায়হান পিএএ বলেন, সারাদেশে হাজার হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করে, দেশি মুরগীর বাণিজ্যিক ভিত্তিক অর্গানিক খামার সম্প্রসারণ এর মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার আগ্রহ থেকেই আমার এ উদ্যোগ। ইতিমধ্যে এ পাঠশালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এ উপজেলাতেই ১ হাজার দুশোর অধিক খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড (হরমোন) ধরনের ওষুধ ব্যবহারমুক্ত দেশী মুরগীর খামার গড়ে উঠেছে। আশা রাখি এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদেও আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি ক্ষমতায়ন নিশ্চিত ও এ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত প্রাণিজ পুষ্টি নিশ্চিত হবে।

এ পাঠশালা সম্পর্কে জানতে চাইলে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী শেখ বলেন, স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ির ব্যাতিক্রমধর্মী এই উদ্যোক্তা পাঠশালা ডাঃ মোঃ রায়হান পিএএ’র অনবদ্য সৃষ্টি। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ এ পাঠশালা থেকে প্রশিক্ষণ যেমনিভাবে নিজেরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, সাথে সাথে বিষমুক্ত প্রাণিজ আমিসের চাহিদাও মিটছে।

উল্লেখ্য, ডা. মো. রায়হান ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ৩১ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মাধ্যমে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার শফিকুল ইসলামের ছেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *