সড়ক দুর্ঘটনা: বগুড়ায় ৩ মাসে নিহত ৩৭

প্রধান খবর বগুড়ার সংবাদ

পারভীন লুনা, বগুড়া:

দুই বছর আগেও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড-মিরসরাই ছিল সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ওই অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমলেও হঠাৎ অতিমাত্রায় দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠছে বগুড়া জেলা। প্রায়ই জেলার বিভিন্নস্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। সংসারের উপার্জনক্ষম একমাত্র অবলম্বন মানুষটিকে হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে অনেক পরিবারের সাজানো স্বপ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, গাড়ির ফিটনেস না থাকা, অদক্ষ চালক ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় যত্রতত্র সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনারোধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ পরিস্থিতি ধারণ করবে।

চলতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বগুড়া জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৭ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে নিহত হয়েছেন ১০ জন ও ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন। মার্চে নিহত হয়েছে ৫ জন। আহত ১০ জন। তবে, সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে। এদিন জেলার শেরপুর উপজেলায় ঢাকা বগুড়া মহাসড়কে ট্রাক-বাসের সংঘর্ষে নিহত হন ৬ জন।

২৬ ফেব্রুয়ারি শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া এলাকায় বাসের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ ৪ জন নিহত হয়েছেন। একইদিন দুপুরে জেলার দুঁপচাচিয়ায় কৃষিগাড়ি এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় এক অটোরিকশার চালকসহ ২ জন নিহত হয়েছেন। ১ মার্চ বগুড়া দুপচাঁচিয়া উপজেলার কাথহালি এলাকায় দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ইসাহাক আলী নামে একব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

অপরদিকে, গত ৭ মার্চ সকাল ৭টায় বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের শেরপুর উপাজেলার রাজাপুর এলাকায় দুই ট্রাকের সংঘর্ষে ট্রাক চালক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুইজন। ১৯ মার্চ শেরপুর উপজেলায় ঢাকা বগুড়া মহাসড়কে বাস ট্রাক সংঘর্ষে নিহত হন ৪জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে সান্তাহার-নওগাঁ সড়কের সাহাপুরে মোটরসাইকেল-অটোরিকশা সংঘর্ষে মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ নামে এক চাতাল ব্যবসায়ীর নিহত হন।

২২ ফেব্রুয়ারি সকালে আদমদীঘি উপজেলায় ঢাকাগামী বাসের ধাক্কায় সিএনজি অটোরিকশার যাত্রী শিল্পী বিশ্বাস নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও দুইজন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ধুনট উপজেলার উপজেলার রুদ্রবাড়িয়া এলাকায় বর যাত্রীবাহী বাস উল্টে নদীতে পড়ে সাধন চন্দ্র (৭০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এসময় আহত হয়েছেন অন্তত ১০জন।

১১ ফেব্রুয়ারি সকালের দিকে শাজাহানপুর উপজেলার দ্বিতীয় বাইপাস সড়কে ট্রাকচাপায় সালভি আক্তার (৪২) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। নিহত সালভি উপজেলার মাঝিড়া থেকে স্বামীর সাথে মোটরসাইকেলে করে সোনাতলার দিকে যাচ্ছিলেন। ১০ফেব্রুয়ারি গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের পেরীরহাট এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাবা-ছেলে নিহত হয়েছেন।

অপরদিকে, ৮ ফেব্রুয়ারি শাজাহানপুর উপজেলার বনানী মোড় এলাকায় তেলবাহী ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। ৭ ফেব্রুয়ারি শেরপুর উপজেলার ফাঁসিতলা-কানাইকান্দর সড়কের সাধুবাড়ী এলাকায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা আহত হয়। পরে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় ট্রাকচাপায় দুই ভাই নিহত হয়েছেন।

২৪ জানুয়ারি রাতে ধুনট উপজেলায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়। পরে তাদের উদ্ধার করে শজিমেক হসপিটালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইরাতেই তাদের মৃত্যু হয়।

এর আগে ১৭ জানুয়ারি সকালে জেলার শেরপুর পৌর এলাকার কাঠালতলায় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ট্রাকের পিছনে ধাক্কা দেওয়ায় একটি পিকআপ চালকের সহকারী নিহত হয়েছেন। একইদিন দুপুরে সদর উপজেলার বাঘোপাড়া বন্দর এলাকায় ট্রাক উল্টে অজ্ঞাতপরিচয় ১ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ১৫ জানুয়ারি বিকেলে জেলার শেরপুর উপজেলার ঘোগা বটতলা সেতু এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন। ১৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর সদর উপজেলার মাটিডালী দ্বিতীয় বাইপাস এলাকায় কাভার্ডভ্যানের চাপায় আব্দুল ফকির (৭০) নামে এক নৈশ প্রহরী নিহত হয়েছেন।

৫ জানুয়ারি সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৫জন আহন হন। ১ জানুয়ারি কাহালু উপজেলার বগুড়া-নওগাঁ সড়কের দরগাহাট বগুড়া ভান্ডার জুটমিল এলাকায় নির্মাণাধীন ব্রিজের গার্ডারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বাসে থাকা ১ যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

নিরাপদ সড়ক চাই(নিসচা) বগুড়া জেলা সভাপতি মো: মোস্তাজিুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনারোধে চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন প্রয়োজন। কাগজে কলমে আইন আছে ঠিকই তার সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। ট্রাফিক বিভাগকেও আরও কঠোর হতে হবে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, ন্যূনতমতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে নজর দিতে হবে।

এছাড়া, গাড়ির ফিটনেস সনদ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে গাড়ি ও চালকের কাগজপত্র নিয়মিত চেকিং করতে হবে। সারাদেশে চারলেন রোড ও রোড ডিভাইডার তৈরি এবং জনগণ ও পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের মাঝে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলে দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *