শখ থেকে সৌখিন উদ্যোক্তা বগুড়ার শাহানাজ

প্রধান খবর বগুড়ার সংবাদ

পারভীন লুনা, বগুড়া

বগুড়া শহরের একজন নারী উদ্যােক্তা। শুধু উদ্যােক্তাই নন বগুড়ার নারী উদ্যােক্তাদের আইডলও তিনি। ব্যাংকার বাবার সন্তান এই উদ্যোক্তা ছোটবেলায় ছিলেন পরিবারে আবদ্ধ। তবে দু’চোখে ছিল নিদারূণ বড় হওয়ার স্বপ্ন। অল্প বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। তবে বিয়ের পরও স্বপ্ন দেখায় থেমে থাকেননি তিনি। প্রকৌশলী স্বামীর সংসারের পাশাপাশি শখের বসে ঘরে হস্তশিল্পের কাজ করতেন। নানান কারুকার্যে কাপড়ের সেলাই, বাটিক ও ব্লকের কাজ করতেন। একদিন প্রকৌশলী স্বামী অফিস থেকে বাসায় ফিরলে নিজের শখের কথা জানান। নিজের ভেতরে লুকায়িত শখ আর স্বপ্নের কথা ভাগাভাগি করেন প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করতে চান। স্ত্রীর এমন স্বপ্ন বাস্তবে রূপদানের কথা শুনে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন তার স্বামী। সাধারণত একটা মফস্বল শহরে একজন নারীকে নিয়ে মানুষের নেতিবাচক মন্তব্য ও সমাজে নিজেদের অবস্থানের কথা ভেবে প্রাথমিকভাবে স্ত্রীকে সাড়া দেননি স্বামী। বলছিলাম বগুড়া শহরের নারী উদ্যোক্তা শাহানাজ ইসলামের কথা। যিনি একজন সৌখিন মানুষ। আর শখ করেই স্বপ্ন দেখেছেন উদ্যোক্তা হওয়ার।

তার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে তার জীবনের এক নাটকীয় গল্প। অল্প বয়সে বিয়ে, স্বামীর সংসার, স্বামী হারানো, উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প অকপটে সব বলতে থাকেন।১৯৭১ সালের মার্চ মাসে জন্ম নেওয়া শাহানাজ ইসলামকে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ১৯৮৫ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে পরিবারের সিদ্ধান্তেই। নববধু হয়ে চলে যান স্বামীর ঘরে। বিয়ের দুই বছর পর ১৯৮৭ সালে এসএসসি পাশ করেন। চাকরিজীবি স্বামীর সংসারে একা বসে না থেকে অল্প স্বল্প নঁকশি কাজ করতেন। এই থেকে মাথায় ঢুকে তার হস্তশিল্প। দীর্ঘবছরের ভাবনা থেকে স্বামীর সাথে পরামর্শক্রমে ১৯৯৮ সালে নিজ বাড়িতে ৩০ জন কর্মচারী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করেন হস্তশিল্পের কাজ। বাড়ির সামনে শখ হস্তশিল্প নামে ছোট্ট সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এরপর বাহারি ডিজাইনের ত্রি পিস সেলাই করে বিক্রি করেন। একপর্যায়ে তার ব্যবসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ক্রেতাদের অর্ডার ছিল লক্ষ্যনীয়। ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায়ও স্থান পেয়েছে শাহনাজ ইসলামের তৈরি পণ্য।

পরবর্তীতে গ্রাহকদের চাহিদার কথা ভেবে ২০০৩ সালে শহরের জলেশ্বরীতলায় শো রুম ভাড়া নেন তিনি। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এভাবেই উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প বলছিলেন শাহনাজ ইসলাম।শাহানাজ ইসলাম বলেন, তখনকার তার একক রমরমা ব্যবসার কথা। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড়ে লন্ডভণ্ড হয়ে যায় তার সাজানো স্বপ্ন। ব্যবসা শুরুর ১০ বছরের মাথায় আচমকা ঝড় শুরু হল তার জীবনে। যেই স্বামীর প্রেরণা আর সাহসে এগিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ সেই চালিকা শক্তি স্বামী চলে যান না ফেরার দেশে। এরপর অনেকটা স্তব্দ হয়ে যান তিনি। স্বামী হারানোর বেদনায় অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। হসপিটালের বিছানায় ঠাঁই মেলে তার। দীর্ঘ অসুস্থতার রেশ কাটিয়ে প্রায় পাঁচবছর পর ২০১৩ সালে নিজের জমানো টাকা, স্বামীর প্রভিডেন্ড ফান্ড ও শহরে একখন্ড জমি বিক্রি করে প্রায় চল্লিশ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন করে শুরু করেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। এখানেও ১৮ জন কর্মচারি নিয়ে পদযাত্রা।

প্রথমদিকেই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বাজিমাত। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দেখলেন লাভ। তার রেস্টুরেন্টের ভাল ব্যবসা দেখে শহরে অনেক নারীই উদ্যোক্তা হিসেবে সামনে এগিয়ে এসেছে। শহরে প্রায় শতাধীক চাইনিজ রেস্টুরেন্টও গড়ে উঠেছে।

শাহানাজ ইসলাম বলেন, তখন বগুড়া শহরে হাতে গোনা দু/চারটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ছিল। এর মধ্যে আমার ক্যাফে শখ সিগনেচার রেস্টুরেন্টটি একটু অভিজাত স্টাইলে ডেকোরেশন করা ছিল। কাস্টমারদের এক্সট্রা আকর্ষণ ছিল এখানে। পাশাপাশি খাবারের মান ভাল হওয়াতে কাস্টমারদের খাবারের চাহিদা মেটাতেও অনেকটা হিমসিম পোহাতে হয়েছে।

কিন্তু রেস্টুরেন্টটি খুব বেশিদিন চালাতে পারিনি। মাত্র ৫ বছরের মাথায় বাড়িটি হাইরাইজ ভবন করতে চলে যায় ডেভলপারের হাতে। ভেঙ্গে দেওয়া হয় পুরণো বাড়ি। এতে আমার চল্লিশ লাখ টাকার ডেকোরেশন ভাঙ্গা পড়ে। যেখানে লাভের মুখ দেখবো সেখানে আমাকে লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে, বলছিলেন শাহানাজ ইসলাম।

তবুও পিছনে ফিরে তাকাননি তিনি। ব্যবসা স্থানান্তর করে লোন করে আবারও রেস্টুরেন্ট শুরু করেন তিনি। কিন্তু দুই বছরের মাথায় এসে থাবা দেয় মহামারী করোনা ভাইরাস। সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ রাখতে হয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ছয় মাসে লোকসান গুণতে হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। পাননি সরকারি প্রণোদনা। করোনা স্বাভাবিক হলে ব্যাংক লোন নিয়ে কর্মচারীদের বেতন ভাতা চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যেন আবারও আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়ার মত। তবুও আশা ছাড়েননি। এখনও কুড়িজন কর্মচারির বেতন, থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা তার বাড়িতেই চলছে। এছাড়া রেস্টুরেন্টের ভাড়াও দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে মাসে তিন লাখ টাকারও বেশি লোকসান হচ্ছে। এই লকডাউনের মধ্যে সরকারি নির্দেশনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় অনলাইনে কিছু অর্ডার সরবরাহ করছেন। রোজা শুরু হওয়াতে অনলাইন ডেলিভারিও বন্ধ রাখতে হয়েছে।

শাহানাজ ইসলাম বলেন, বগুড়া শহরে আমিই প্রথম নারী উদ্যেক্তা। সফল উদ্যােক্তা হতে না পারলেও অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছি কানাডায়। আরেক সন্তান ঢাকায় একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট সন্তান বগুড়াতেই পড়াশোনা করছে। কাপড়ের ব্যবসা পুণরায় শুরু করার প্রসঙ্গে শাহনাজ ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও কাপড়ের ব্যবসা শুরু করবো। কারণ কাপড়ের ব্যবসা হল আমার ব্যবসার প্রাণ। কাপড়ের ব্যবসার কারণেই আমি আজকের অবস্থানে। আর আমার ব্যবসা দেখেই, আমাকে অনুসরণ করেই এই শহরে অনেক নারীই আজ উদ্যােক্তা। বেকারত্ব ঘুছিয়ে আজ তারা স্বাবলম্বী। আমি তাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করি।

শিক্ষিত তরুণ তরুণীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি চাই বিশেষ করে মেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি যে কাজ কমফোর্টেবল মনে করবে সেই কাজের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা যেন উদ্যোক্তা হয়। পড়ালেখা শেষে চাকরির পিছনে না ঘুরে তারাই যেন চাকরি দিতে পারে এমন মানসিকতা থাকতে হবে। তাহলেই সমাজে নারী পুরুষের সমতা নিশ্চিত হবে। জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে। নারী উদ্যোক্তা তৈরী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *