বগুড়ার মাসুমা গৃহিনী থেকে গরুর মাংসের আচারে সফল উদ্যোক্তা

প্রধান খবর বগুড়ার সংবাদ

পারভীন লুনা,বগুড়া:

মাসুমা ইসলাম বগুড়া শহরের সিও অফিস কইগাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তাঁর স্বামী রাজিবুল ইসলাম চাকরি করতেন শহরের তারকা হোটেল নাজ গার্ডেনে, সহকারী হিসাব ব্যবস্থাপক পদে। গত বছরের এপ্রিলে করোনার সংক্রমণ ও লকডাউন শুরু হলে হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন রাজিবুল। রোজগার বন্ধ। ঘরে মা, ভাই, স্ত্রী, দুই সন্তান দিশেহারা হয়ে পড়েন রাজিবুল। মাসুমা তখন সংসারের হাল ধরতে রাজিবুলের পাশে দাঁড়ান। ছোট বোনের কাছ থেকে তেরো হাজার টাকা ধার নেন মাসুমা। প্রথমে শুরু করেন শাড়ী,কাপড়ের ব্যবসা। এ সময় অনলাইনে পণ্য বিক্রির চিন্তা মাথায় আনেন। সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁতের শাড়ি কিনে এনে অনলাইনে বিক্রি করা শুরু করেন।

ফেসবুকে পেজ খুলে পণ্যের ছবি আপলোড করেন। খবর পান উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরামের (উই)। উই প্ল্যাটফর্মে পণ্যের ছবি দেন।সারা পান তিনি।উৎসাহ বেড়ে যায় মাসুমার।

তার ফেসবুকে শারীর ছবি দিয়ে বিক্রয় করতে শুরু করেন।কাপড়ের বিজনেসে সন্তোষ জনক সারা না পেয়ে তিনি থমকে যাননি।মাসুমা চিন্তা করেন শারী,কাপড়ের বিজনেস তো অনেকেই করেন,তিনি এমন কিছু করতে চান যার ভিন্নতা আছে।আনকমন কিছু। শাশুরীর কাছ থেকে গল্প শুনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন মাংসের আচার বানাবেন।আর বাড়িতে নানা রকম আচার বানানো শুরু করেন তিনি। বিক্রির জন্য তো দোকান লাগবে।এই আচার তিনি কই বিক্রি করবেন?চিন্তায় পরেন মাসুমা। মাসুমাকে তার দেবর সজীব ফেসবুক পেইজ খুলে দেন।

অল্প দিনেই সাড়া পান মাসুমা।অর্ডার বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে কাজ। স্বামী রাজিবুলও এসে পাশে দাঁড়ান। বাড়িতে ছোট পরিসরে গড়ে তুলেছেন আচারের কারখানা।তবে মাসুমার আচার ব্যবসায় ঝড় তুলেছে গরুর মাংসের আচার। মাসে এখন ৩০থেকে ৪০ কেজি গরুর মাংসের আচার বিক্রি করেন তিনি। নানা রকম আচারের পাশাপাশি অনলাইনে ঘি, দই, লাচ্ছা সেমাও বিক্রি করেন তিনি।মাসুমা বলেন, বাবার বাড়ি,শশুর বাড়ি কোথাও রান্না করতে হয়নি আমায়,আমার শাসুরী বলেন তুমি বাচ্চা দেখাশুনা করো রান্না করতে হবেনা। শাশুরী পারুল বেগম প্রায় গল্প করেন আগে ফ্রিজ ছিলোনা,আগেকার মানুষ মাংসের আচার বানিয়ে ছয়,সাত মাস ঘরে রাখতেন।শাশুরীর কাছ থেকে শুনা গল্পেই তিনি মাংসের আচার তৈরি করেন।ব্যপক শারা পান।শাশুড়ির কাছ থেকে শিখেছেন অনেক ধরনের আচার তৈরি করা।

মাসুমা ইসলাম বলেন, গরুর মাংসের এই আচার খুব মজার ও লোভনীয়। খিচুড়ি, পোলাও, সাদা ভাতের সঙ্গে খাওয়া যায়। সর্ষের তেলে মাংস ডুবে থাকে বলে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। মাসুমা জানান, সারা দেশেই তাঁর আচারের বাজার রয়েছে। তবে বগুড়া, রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, গাজীপুর থেকে বেশি অর্ডার আসে এই আচারের। দেশের বাইরে আমেরিকা, লন্ডন, দুবাই , মালয়েশিয়া, চীন, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুরেও এই আচার পাঠিয়েছেন তিনি। উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) গ্রুপে সবচেয়ে বেশি আচার বিক্রি হয়। উই ছাড়া ঢাকা বিজনেস গ্রুপ, খুলনা বিজনেস সোসাইটি, বগুড়া বিজনেস কেয়ার, বগুড়া বিজনেস গ্রুপ, ভিক্টোরিয়া ই-কমার্স ফোরাম, নানা গ্রুপে মাসুমা তাঁর পণ্য বিক্রি করেন।মাসুমা বলেন স্বামী রাজিবুল ইসলাম কাঁচামাল কেনা, কুরিয়ারে পণ্য বুকিং দেওয়ার মতো কাজে তাকে সহযোগিতা করেন।

’করোনা কালে মাসুমার পরিবার হুমকির মুখে পরতে বসেছিলো কিন্তু সেখান থেকে মাসুমা নিজ চেষ্টায়, কঠোর পরিশ্রম করে পথ বের করে নিয়েছেন। করোনার করাল গ্রাস এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে মাসুমা গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুরুতে আম, জলপাই, বরই, আমলকী, রসুন, মরিচের আচার তৈরি করেছেন মাসুমা। সবচেয়ে বেশি সাড়া মিলছে গরুর মাংসের আচারে। নিজের ব্র্যান্ডের নাম দিয়েছেন আরএস ফুড কর্নার। গরুর মাংসের আচার ১২০০, রসুনের আচার ৬০০ এবং আমসহ অন্যান্য আচার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। সারা দেশ থেকে অর্ডার আসছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকার শুধু আচার বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য পণ্য বিক্রি থেকে মাসে আয় গড়ে ২০ হাজার টাকা। এ থেকে যে লাভ হয়, তাতেই তাঁদের সংসার চলছে ভালোভাবে। মাসুমার এই সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের নির্দেশে তাঁকে ঋণসহ সব ধরনের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।মাসুমা বলেন করোনা কালে গভর্নর স্যার আমার পাশে দারিয়েছেন,আমাকে সাহস দিয়েছেন এতে আমি স্যারের কাছে কৃতিত্ব। আমি অনন্যা গ্রোপের এডমিন ফাতেমা লিসা বলেন আমার গ্রোপটা খুলেছি মহিলা উদ্যোক্তা দের প্লাটফর্ম তৈরি করার জন্য। আমি চাই প্রতিটা মহিলা নিজের পায়ে দাড়াক, নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করুক, মহিলারা ছেলেদের অনুগ্রহ হয়ে থাকুক এটা আমি চাই না এটাই আমার উদ্দেশ্য। এই গ্রুপে সদস্যের তৈরি আচার দেশের বাহিরে যাওয়ায় আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *